_মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার_ | রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০২৪ | প্রিন্ট | 864 বার পঠিত
তাঁর জীবদ্দশায় বুঝিনি কথার মানে। নিজের হতাশা থেকেই মাঝেমধ্যেই বলতাম, স্যার এভাবে আর কতো? ছোট্ট কথায় তিনি বলতেন, পতন অনিবার্য। দুঃশাসন অস্থায়ী। একদিন পাল্টা প্রশ্ন ছিল, লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। স্যারের জবাব, লক্ষণ না দেখাও একটি লক্ষণ।
বলছি, এমাজউদ্দীন স্যারের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর- ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন। । আদর্শিক পথের দিশা পেতে ব্যক্তি ও পেশাগত সত্তার বিকাশের জন্য উচ্চতর নৈতিক ও মানবিক আদর্শের উপমার জন্য আমাদেরকে বার বার ফিরে যেতে হবে কালের জ্যোর্তিময় শিক্ষক’ অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীনের কাছেই। তার সম্পর্কে কিছু লিখতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। সন্তানের মতো আদর করতেন আমাকে। তিনি আমাকে যা দিয়ে গেছেন এই জনমে তা অমূল্য –অতুলনীয়। সেটি আজকের প্রসঙ্গ নয়। বিশাল এই ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু লেখা আমার জন্য কঠিন। কিন্তু, আবেগের কাছে হার মানতে হচ্ছে। বলতেই হচ্ছে, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ আমার জীবন চলার পথে কেবল শিক্ষনীয় নয়, একটি শক্তিও।
রাষ্ট্র ও সামাজিক বিষয়ে বিদ্যায়তানিক সংগ্রামশীলতা নান্দনিক গবেষণা আর জ্ঞান চর্চার আধুনিক বিদ্যাবংশের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কালের জ্ঞান মার্গের শেষ ধ্রুপদী এই মুগলের জন্ম মালদহ জেলার কালিয়াচক থানার কালিনগরে ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বরে। ২০২০ সালের ১৭ জুলাই মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও একদিন খুব আফসোস করে বলেছিলাম, দুঃশাসনের এই রেজিম কি তবে চিরস্থায়ী হয়ে যাচ্ছে? বললেন, এভাবে বলে না বাপু। পতন সব সময় বলে কয়ে আসে না।
অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে স্যারের কথা। অপশাসনের পতন হয়েছে। ধেয়েছে মাফিয়াতন্ত্র। কিন্তু, প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ আমাদের মাঝে নেই। আর ফিরেও আসবেন না। আমাকে এতিম করলেও তার কাজ আমাদের মধ্যে রয়ে গেল। তার চিন্তা, তার বিশ্বাস, তার কাজ আমাদেরকে আরো শক্তিশালী করবে, সাহস যোগাবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একজন দৃঢ় প্রবক্তা, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের একজন অতন্দ্র প্রহরী, গণতন্ত্রের একজন সাহসী বলিষ্ঠ সংগ্রামী যোদ্ধা প্রফেসর এমাজউদ্দীন আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছেন। যোগাবেনও। প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রোশ নয়, উদার গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে তিনি আমাদের পথ দেখাবেন। ড. এমাজউদ্দীন আহমদের যে রাষ্ট্রচিন্তা ছিল, সেটা ছিল দেশ, সমাজ, জাতি, রাজনীতি, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এর সমন্বয়ই তার চিন্তা-চেতনা। যে সময়ে যা প্রয়োজন পরামর্শ দেয়ার, সেই সময়কে ধারণ করে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সেই সময় জাতির জন্য কী করা প্রয়োজন, দেশের সরকারের কী করা প্রয়োজন, রাজনৈতিক দলগুলোর কীভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, তিনি নীতিনির্ধারণী জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দিয়েছেন, কলাম লিখেছেন, বই রচনা করেছেন। তিনি যে কিছু দূঃখ নিয়ে বেঁচেছিলেন, তা অনেকেরই অজানা। জানার কথাও নয়।
অভিভাবকত্ব কতটা দায়িত্বশীল হতে পারে, তাঁকে না দেখলে আমার জানা হতো না। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে তাঁর মধ্যে মিলে মিশে একাকার হয়েছে পিতার হৃদয়। বিনয় ও কোমলতার মিলিত জোসনা তাঁকে দিয়েছে অতল গভীরতার স্নিগ্ধতা। যার কিছু ছোঁয়া জুটেছে আমার ভাগ্যে।
আমার এ প্রেমময়-স্নেহময় পিতা যে অব্যক্ত কষ্ট নিয়ে গত হয়েছেন তা পরে এক সময় লেখার ইচ্ছা রাখি। আজ অপশাসনের বিদায়ের আনন্দের সময় তা সামনে না আনাই ভালো। ধীর-বিচক্ষণ ইস্পাতের দৃঢ়তাকে আজ কেবল শ্রদ্ধা স্মরণের দিন। শুধু এতোটুকু বলবো, সঙ্কটে তিনি সকলের আশ্রয়, আশ্বাস ছিলেন। গণতন্ত্র আর বাংলাদেশের সঙ্কট যেন তাঁর ব্যক্তিগত সঙ্কটই ছিল। ড. আকবর আলী খান অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদকে ‘এমাজ ভাই’ বলে ডাকতেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম পরিচয় ঘটে ড. আকবর আলী খানের সঙ্গে সুদূর কানাডায় কিংশটন শহরে। ড. আকবর আলী সকলের ‘এমাজ ভাই’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বাঙালিদের মধ্যমণি ছিলেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ছিলেন সকলের এমাজ ভাই। অসাধারণ অমায়িক ও অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল এই ব্যক্তিত্ব ছিলেন সকলের পরামর্শদাতা। সকলের বিপদে আপদে তিনি সকলের আগে এগিয়ে আসতেন। হাসি মুখে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। বাঙালীদের বাহিরে ভারতীয় ও পাকিস্তানী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।”
অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে ভূয়সী করেছেন বিভিন্ন সময়। আর জীবনের অনেকগুলো বছর তার সেবায়েতের মতো স্যারের সঙ্গে থাকার সুবাদে তাকে কখনো শান্ত প্রাণবন্ততা ছাড়া দেখিনি। অপশাসনের পতন হবেই এ কথাটিও তিনি আমাকে খুব মিষ্টি এবং স্বাভাবিক ভাষাতেই বলেছিলেন। নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ওই ফারেনহাইটে যায়নি বলে তখন এর মানে ঠিকভাবে বুঝিওনি। তবে, এটা বুঝেছি যে, চিন্তাশীলরা এমনই হন। তার মৃত্যুর তিন-চার বছর পর তা আরেকটু বেশি উপলব্ধি করছি। আর উপলব্ধি করছি বলে কষ্টটা আরেকটু বেশি পাচ্ছি।
সবাইকে আপন করে, সবার জন্য কিছু করার সদিচ্ছা, কাউকে দূরে সরিয়ে না রেখে পিতার তো আগলে রাখার সেই ব্যক্তিটিই আমার শক্তি। তাঁর প্রাপ্য বা প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ার দহনও আমার প্রাপ্তির মতো হয়েই থাক। আর আফসোসের জায়গায় পড়ে থাক তার মতো নির্মোহ হতে না পারার বেদনা। কে মনে রাখলো, কে রাখলো না –তা বিষয় নয়। বাংলার আকাশে মুক্তভাবে বাতাস নেয়ার এই সোনালী সময়ে আমার মতো আরো কারো কাছে স্মরণীয় আছেন, থাকবেন। স্যার জীবিত থাকলে কতোটুকু খুশি হতেন, তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সুচিন্তিত পরামর্শ দিতে পারতেন। দিকনির্দেশনা দিতে পারতেন দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলা করার।
_লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলা পোস্ট ‘ ও প্রকাশক : বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা_
Posted ৯:১১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০২৪
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।